Search This Blog

Tuesday, May 19, 2015

পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়য়ের “অভাগীর স্বর্গ”

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়য়ের “অভাগীর স্বর্গ” পাঠ পরবর্তী মতামত

সমাজ মানেই নরকের খণ্ডিত চিত্র । সমাজ মানেই অনাচার, অত্যাচার আর ভণ্ডামির নগ্ন চিত্র । সমাজের জাতিভেদ মানেই মানবতাকে লুণ্ঠিত করা, পদদলিত করা আর ঈশ্বরকে অপমান করা । লেখকদের সমালোচনা বুঝি এই কারণেই করা হয় কারণ তারা আমাদের চোখে দেখা সমাজের সাধারণ ঘটনাগুলোর বীভৎসতা তুলে ধরেন ।
এমনই একজন লেখন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যিনি তার লেখায় তুলে ধরেছেন সমাজের নানান সমস্যা, ধর্মীয় কুসংস্কার এবং অনাচার যেগুলো আপাতদৃষ্টিতে আমাদের কাছে খুবই সাধারণ মনে হয় । কিন্তু সেগুলোর ভয়াবহতা যে কি রূপ ধারণ করতে পারে তা তুলে ধরেছেন তিনি তার লেখায় ।
বলছি শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়য়ের “অভাগীর স্বর্গ” নামক গল্পের কথা । আমার একজন নবম শ্রেণীর ছাত্র রয়েছে । তাকে গত কদিন আগে আমাকে এই গল্পটি পড়ে বুঝিয়ে দিতে হল । কিন্তু গল্পটি পড়তে গিয়ে দেখি আমার শরীরের লোম খাড়া হয়ে গিয়েছে এবং আমার চোখও কিছুটা ঝাপসা হয়ে এসেছে । আরও অবাক হলাম যখন দেখলাম যে আমার ছাত্রের চোখ বেয়ে অঝোর ধারায় পানি পড়ছে । পুরো গল্পটি শেষ করার পরেও দেখি যে সে চুপচাপ বসে আছে । হয়তো তখনও সে ডুবে ছিল গল্পের মাঝে বা হয়তো আমি বাংলাও ভালো পড়াতে পারি সেই কারণে । তবে গল্প বুঝতে গেলে গল্পকে অনুভব করতে হয় । ডুব দিতে হয় চরিত্রের গভীরে । চরিত্রগুলোর জায়গায় নিজেকে কল্পনা না করলে মনে হয় গল্প অনুভব করা যায় না । গল্পটি পড়ে আমার মনে পড়ে গিয়েছিল “মহেশ” এবং “ছুটি” গল্প দুটির কথা যেগুলো আমাকে প্রায় একই রকম অনুভূতিতে নাড়া দিয়েছিল ।
হিন্দু সমাজে নিচু জাতি বলে কি দুলেরা শ্মশানে যেতে পারবে না ? নিচু জাতি হবার জন্য কি তাদের জন্য স্বর্গ থেকে রথ আসবে না ? নিচু জাতি বলে কি তারা তাদের আত্মীয় স্বজনদের চিতায় দিতে পারবে না ? নাকি নিচু জাতি বলে তাদের স্বর্গেও প্রবেশ নিষেধ ?
অসাধারণ কিছু প্রশ্ন ! যারা ঈশ্বরে বিশ্বাস করে তারাও বুঝতে পারবে যে এখানে মূলত ঈশ্বরকেই অপমান করা হয়েছে এই ধরণের জাতিভেদের মাধ্যমে । এরকমই কিছু কঠিন প্রশ্ন তুলে ধরেছেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর “অভাগীর স্বর্গ” নামক গল্পে নানান ঘটনার মাধ্যমে ।
গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র ‘অভাগী’ এবং তার একমাত্র সন্তান ‘কাঙ্গালি’ । অভাগীর নাম অভাগী কেন দেওয়া হয়েছে সেটা জানার জন্য আমাকে বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়েছে । অভাগী নামকরণের কারণ তো জানতে পারলাম তবে অভাগীর স্বর্গ বলতে কি বুঝানো হয়েছে তা বুঝতে আমাকে আরও অপেক্ষা করতে হয়েছে একদম গল্পটির শেষ লাইন পর্যন্ত । তবে আমার কাছে এখানে অভাগীর স্বর্গের দুটো অর্থ আছে বলে মনে হয়েছে । এক হল অভাগীর সন্তান কাঙ্গালি এবং দুই হল স্বর্গ, যে স্বর্গ আমারা কামনা করে থাকি আমাদের মৃত্যুর পরের জীবনে ।
হিন্দু সমাজের জাতিভেদ, নিচু জাতির প্রতি অত্যাচার, ধর্মীয় নানান কুসংস্কার যার বেড়াজাল থেকে উঁচু হিন্দু সমাজও মুক্ত নয়, জমিদারদের অত্যাচার এবং তাদের খাজনা আদায়ের বীভৎস দৃশ্য ফুটে উঠেছে এই গল্পে । এর বাইরেও উঠে এসেছে একজন অপরাধী কিভাবে নতি স্বীকার করে ভালবাসার কাছে, কিভাবে একজন নির্দয় মানুষের মনও গলে যেতে পারে পরম ভালবাসায় । আর যে দৃশ্যটি সবচেয়ে আমার নজর কেড়েছে তা বল মা ও সন্তানের সম্পর্ক । মাকে সন্তানের এবং সন্তানকে মার আগলে রাখা, মার গলা জড়িয়ে ধরে গল্প শুনা ইত্যাদি । লেখক তুলে ধরেছেন কিভাবে একজন মা এবং সন্তান তাদের পরস্পরের প্রতি অবিচল আস্থা এবং ভালবাসা নিয়ে বেঁচে থাকতে পারেন ।
গল্পটি পড়ে হয়তো আমি একটু বেশিই আবেগে আপ্লুত হয়ে গিয়েছি । একজন মাকে নিয়ে গল্প তো, তাই হয়তো । আমারও মা নেই তাই জোর করে ভুলে থাকা মায়ের অভাবগুলো আবারও মনের মাঝে নতুন করে জেগে উঠে নাড়া দিয়েছিল । আশা করি আপনাদেরও ভালো লাগবে গল্পটি । বর্তমানে নবম-দশম শ্রেণীর বাংলা পাঠ্য বইয়ে গল্পটি খুঁজে পাবেন । এই বাইরে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়য়ের ছোট গল্পের বইয়েও পাবেন এবং উনার ওয়েবসাইটেও পাবেন । 

Link: http://www.sarat-rachanabali.nltr.org/content.jsp?002046001001

No comments:

Post a Comment